বৃহস্পতিবার বৈঠকে বসছেন চীনা ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট

যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য বিবাদ প্রশমনের ইঙ্গিত ট্রাম্পের

বিশ্বের দুই শীর্ষ অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য বিবাদে প্রভাবিত হচ্ছে সামগ্রিক সরবরাহ চেইন ও বৈশ্বিক অর্থনীতি।

বিশ্বের দুই শীর্ষ অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য বিবাদে প্রভাবিত হচ্ছে সামগ্রিক সরবরাহ চেইন ও বৈশ্বিক অর্থনীতি। এরই মধ্যে বৈশ্বিক জিডিপিকেও চাপে ফেলেছে এ বাণিজ্য বিবাদ। সাম্প্রতিক মাসগুলোয় দফায় দফায় বৈঠকের পর অবশেষে এবার সুসংবাদ দিলেন বিবাদমান দেশ দুটির কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, আসন্ন বাণিজ্য চুক্তির প্রেক্ষাপটে একটি কাঠামো বা ফ্রেমওয়ার্কে একমত হতে পেরেছে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র। এতে চীনা পণ্যের ওপর ১৫৭ শতাংশ মার্কিন শুল্ক আরোপের আশঙ্কা আপাতত দূর হয়েছে। চূড়ান্ত পর্যায়ে এটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠকে বাণিজ্য চুক্তি বিষয়ে আলোচনার পথ উন্মুক্ত করেছে। খবর সিএনএন।

দ্বিতীয় দফায় হোয়াইট হাউজে প্রবেশের পর ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম এশিয়া সফর এরই মধ্যে তাৎপর্যপূর্ণ বলে চিহ্নিত হয়েছে। আসিয়ান সম্মেলনে অংশ নিতে গত রোববার মালয়েশিয়ায় পৌঁছেন তিনি। এদিনই ট্রাম্প জানান, বাণিজ্য কাঠামো নিয়ে কুয়ালালামপুরে আলোচনায় থাকা চীন ও মার্কিন প্রতিনিধি দল ঐকমত্যে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছে। তিনি একটি চুক্তির বিষয়ে আশাবাদী। এ ইতিবাচক ইঙ্গিতের মাধ্যমে বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির মধ্যে সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি কিছুটা প্রশমিত হয়েছে। এ খবরের পর এশিয়ার পুঁজিবাজার ও মার্কিন শেয়ার ফিউচার উভয়ই ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে।

কুয়ালালামপুরে মার্কিন প্রতিনিধি দলে উপস্থিত ছিলেন দেশটির বাণিজ্যমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। তিনি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘আগামী বৃহস্পতিবার দুই নেতার মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। সে বৈঠককে এগিয়ে নিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোয় পৌঁছেছি আমরা।’

গত মে মাসের পর এ নিয়ে পঞ্চম দফায় আলোচনায় অংশ নিলেন চীন ও মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধিরা। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে নেতৃত্ব দেন দেশটির বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার।

সম্প্রতি দুষ্প্রাপ্য খনিজ রফতানির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরো কঠোর করেছে চীন। এর পরিপ্রেক্ষিতে শতভাগ শুল্ক আরোপের হুমকি দেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে সে আশঙ্কা দূর হয়েছে। স্কট বেসেন্ট জানিয়েছে, চীনা পণ্যের ওপর ট্রাম্পের হুমকি দেয়া শতভাগ শুল্ক এখন কার্যত ‘টেবিলের বাইরে’। অর্থাৎ সে শুল্ক বাতিল বা স্থগিত।

সব ঠিক থাকলে আগামী বৃহস্পতিবার দক্ষিণ কোরিয়ায় এশিয়া-প্যাসিফিক ইকোনমিক কো-অপারেশন (এপিইসি) সিইও সম্মেলনের সাইডলাইন শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউজে প্রবেশের পর এবারই প্রথম চীনা প্রেসিডেন্টের মুখোমুখি হচ্ছেন তিনি। বৈঠকটি আদৌ হবে কিনা তা নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা থাকলেও ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেছেন, তারা আলোচনায় বসতে যাচ্ছেন। এমনকি পরবর্তী সময়ে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রে তাদের সাক্ষাৎ হতে পারে। কুয়ালালামপুরে ট্রাম্পের এমন মন্তব্যের পর এখন সবার নজর ওই বৈঠকের দিকেই।

অবশ্য চীন এখনো বৈঠকের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি। সাধারণত এ ধরনের বৈঠক শুরু না হওয়া পর্যন্ত কোনো তথ্য প্রকাশ করে না বেইজিং। তবে মালয়েশিয়ায় আলোচনাকারীদের ইতিবাচক বার্তা আশাবাদী পরিবেশ তৈরি করেছে।

গত সেপ্টেম্বরে রফতানি পণ্যের কালো তালিকা সম্প্রসারণ করে যুক্তরাষ্ট্র। এ তালিকায় চীনের কিছু কোম্পানির নাম প্রথমবার যুক্ত হয়। এতে কোম্পানিগুলোর জন্য মার্কিন প্রযুক্তি প্রাপ্তির সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়। প্রতিক্রিয়াস্বরূপ দুষ্প্রাপ্য খনিজ রফতানির ওপর নতুন নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে বেইজিং। এরপর ট্রাম্প নতুন করে চীনা পণ্যে শতভাগ শুল্কের ঘোষণা দেন।

অবশ্য চীন ও যুক্তরাষ্ট্র কোনো পক্ষই ফ্রেমওয়ার্কের পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করেনি। দুষ্প্রাপ্য খনিজ রফতানি নিয়ন্ত্রণে স্থগিতাদেশ দিতে পারে চীন উল্লেখ করে স্কট বেসেন্ট বলেন, ‘এ বাণিজ্য কাঠামো ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিনপিংকে খুবই ফলপ্রসূ বৈঠকের সুযোগ করে দেবে।’

তিনি আরো জানিয়েছেন, কাঠামো অনুসারে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ‘উল্লেখযোগ্য পরিমাণে’ সয়াবিন কিনবে চীন। ইলিনয়, আইওয়া, মিনেসোটা ও ইন্ডিয়ানার মতো মার্কিন অঙ্গরাজ্যের কৃষকরা এখন শরৎকালীন সয়াবিন সংগ্রহ করছেন। একসময় মার্কিন সয়াবিনের সবচেয়ে বড় ক্রেতা ছিল চীন। তবে দীর্ঘদিন ধরে কোনো ক্রয়াদেশ দেয়নি তারা।

চলতি বছরের শুরুতে চীনের ওপর শুল্ক চাপিয়ে দেয়ার কারণ হিসেবে সিন্থেটিক মাদক ফেন্টানিল পাচারের অভিযোগকে সামনে নিয়ে এসছিলেন ট্রাম্প। এ নিয়ে স্কট বেসেন্ট বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে এ মাদকের উপাদান পাচার রোধে দুই দেশ প্রাথমিকভাবে পরস্পরকে সহযোগিতায় সম্মত হয়েছে।’

এছাড়া শর্ট ভিডিও প্লাটফর্ম টিকটক-সংক্রান্ত একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছেছে দুই পক্ষ। মার্কিন আইনে টিকটকের যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সম্পদ স্থানীয় ক্রেতার কাছে বিক্রি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আলোচনার মাধ্যমে দুই দেশ এ বিষয়ে চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছেছে।

মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আজ পর্যন্ত সব বিষয় বিস্তারিতভাবে ঠিকঠাক সমাধান হয়েছে। এখন এটি দুই নেতার অনুমোদনের বিষয়।’

এদিকে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিনহুয়া জানিয়েছে, দুই দেশের আলোচকরা ‘নিজ নিজ উদ্বেগ মোকাবেলায় একটি প্রাথমিক ঐকমত্যে’ পৌঁছেছেন।

চীনের ভাইস প্রিমিয়ার হে লিফেংকে সঙ্গে নিয়ে দেশটির প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন প্রধান বাণিজ্য আলোচক লি চেংগ্যাং। তিনি বলেন, ‘চীন নির্মিত জাহাজে যুক্তরাষ্ট্র আরোপিত বিশেষ বন্দর শুল্ক, বাণিজ্য যুদ্ধবিরতি সম্প্রসারণ, ফেন্টানিলের ওপর শুল্ক, অবৈধ মাদক দমন ও রফতানি নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন ইস্যুতে দুই পক্ষ বিস্তারিত আলোচনা করেছে।’

তার ভাষ্যে, গত মাসে দুই দেশের মধ্যে যে অস্থিরতা দেখা গিয়েছিল, চীন তা চায়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবস্থানের মাঝেও চীন নিজের স্বার্থ রক্ষায় দৃঢ় অবস্থান বজায় রেখেছে।

সিনহুয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, উভয় পক্ষ নির্দিষ্ট বিষয়গুলো চূড়ান্ত করতে এবং নিজ নিজ অভ্যন্তরীণ অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সম্মত হয়েছে।

আরও